পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবকদের জন্য বড় ভরসা হয়ে উঠেছে WB Yuba Sathi Scheme। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণ-তরুণীদের সাময়িক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। প্রকল্প অনুযায়ী যোগ্য আবেদনকারীরা প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন, যা বছরে দাঁড়ায় ১৮,০০০ টাকা এবং পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ৯০,০০০ টাকা।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সব আবেদন গৃহীত হচ্ছে না। বহু ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় আবেদন বাতিল হচ্ছে। ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত—ফর্ম জমা দিয়েও কেন টাকা মিলছে না? এই প্রতিবেদনে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হল কোন ভুলে আবেদন বাতিল হতে পারে, কীভাবে তথ্য যাচাই হয় এবং কীভাবে নিশ্চিত করবেন আপনার আবেদন যেন বাতিল না হয়।

Read Also: E Shram Card 2026: কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে মাসিক ₹৩,০০০ পেনশন ও একাধিক সুবিধা

যুবসাথী প্রকল্পের উদ্দেশ্য: কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

রাজ্যে বহু শিক্ষিত যুবক-যুবতী পড়াশোনা শেষ করেও দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি পাচ্ছেন না। চাকরি খোঁজার সময় যাতায়াত, ফর্ম ফিল-আপ, প্রশিক্ষণ বা পরীক্ষার খরচ মেটাতে আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে সাময়িক সহায়তা দিতেই যুবসাথী প্রকল্প চালু হয়েছে।

এই প্রকল্প কোনো স্থায়ী চাকরি নয়, বরং কর্মসংস্থান পাওয়ার আগ পর্যন্ত একটি আর্থিক সহায়তা। তাই সরকার বিশেষভাবে নজর রাখছে যাতে প্রকৃত বেকার যুবকরাই এই সুবিধা পান।

প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য এক নজরে

যুবসাথী প্রকল্পে মাসিক ১,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে মাধ্যমিক পাশ হওয়া প্রয়োজন। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই সহায়তা চালু থাকতে পারে, যদি আবেদনকারী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন।

আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত সরকারি শিবির বা নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে একাধিক স্তরে যাচাই করা হয়।

কেন বাতিল হচ্ছে আবেদন? জানুন প্রধান কারণগুলো

অনেকেই ভাবেন, ফর্ম জমা দিলেই টাকা পাওয়া নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবে আবেদন যাচাইয়ের সময় বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেস মিলিয়ে দেখা হয়। সেখানে তথ্যের অমিল ধরা পড়লেই আবেদন বাতিল হতে পারে।

১. কর্মসংস্থানের প্রমাণ মিললে

যদি আবেদনকারীর নামে প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) বা ইএসআই (ESI) সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে ধরে নেওয়া হয় তিনি কর্মরত। সেক্ষেত্রে তাঁকে ‘বেকার’ হিসেবে গণ্য করা হবে না। এমনকি অস্থায়ী চাকরি হলেও আয়ের তথ্য সরকারি ডেটাবেসে থাকলে আবেদন খারিজ হতে পারে।

২. অন্য সরকারি মাসিক ভাতা পেলে

যদি কেউ ইতিমধ্যেই নিয়মিত অন্য কোনও সরকারি ভাতা পান, তাহলে যুবসাথীর জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। তবে শিক্ষা সংক্রান্ত স্কলারশিপ সাধারণত আলাদা হিসেবে বিবেচিত হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে সরকারি যাচাইয়ের উপর।

৩. নথিতে অসঙ্গতি

নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা বা ব্যাঙ্ক তথ্য যদি সরকারি নথির সঙ্গে না মেলে, তাহলে আবেদন আটকে যেতে পারে। অনেক সময় ছোট বানান ভুলও সমস্যার কারণ হয়।

৪. ভুয়ো তথ্য বা তথ্য গোপন করা

চাকরি লুকিয়ে রাখা, আয়ের তথ্য গোপন করা বা ভুয়ো নথি জমা দিলে আবেদন শুধু বাতিলই নয়, ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

কীভাবে তথ্য যাচাই হয়? পর্দার আড়ালের প্রক্রিয়া

অনেকে ভাবেন আবেদন মানেই কাগজ জমা দেওয়া। বাস্তবে কিন্তু একাধিক স্তরে যাচাই হয়। প্রথমে প্রাথমিক নথি পরীক্ষা করা হয়। এরপর সরকারি ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয় আবেদনকারীর কর্মসংস্থান বা ভাতা গ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনিক তদন্তও হতে পারে।

এই বহুস্তরীয় যাচাইয়ের কারণেই ভুল তথ্য দিলে তা ধরা পড়ে যায়।

চাকরি পেলে কী করবেন?

যুবসাথী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কর্মহীনদের সহায়তা করা। তাই আবেদন অনুমোদনের পর যদি কেউ চাকরি পান, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো উচিত। চাকরি পাওয়ার পরও সুবিধা নিতে থাকলে আইনগত সমস্যা তৈরি হতে পারে।

চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ী কাজের ক্ষেত্রেও আয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তাই স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

আবেদন করার আগে যেসব বিষয় অবশ্যই যাচাই করবেন

ফর্ম পূরণের আগে নিজের সমস্ত নথি আপডেট আছে কি না তা দেখে নিন। নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা যেন আধার, ভোটার কার্ড ও অন্যান্য নথির সঙ্গে মিলে যায়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিজের নামে সক্রিয় থাকতে হবে। অন্য কোনও সরকারি ভাতা পাচ্ছেন কি না, তা পরিষ্কারভাবে জেনে নিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ফর্ম জমা দেওয়ার আগে একবার সম্পূর্ণ পড়ে দেখে নিন। তাড়াহুড়ো করলে ছোট ভুল বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।

আবেদন বাতিল হলে কী করবেন?

যদি আবেদন বাতিল হয়, প্রথমে কারণ জেনে নেওয়া জরুরি। অনেক সময় সামান্য নথিগত ত্রুটির কারণে আবেদন খারিজ হয়। সংশোধনের সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় নথি আপডেট করে পুনরায় আবেদন করা যেতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট অফিস বা পোর্টালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে যুবসাথীর প্রভাব কী হতে পারে?

মাসিক ১,৫০০ টাকা বড় অঙ্ক না হলেও চাকরি খোঁজার সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। যাতায়াত, অনলাইন আবেদন, প্রশিক্ষণ বা পরীক্ষা ফি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থ সহায়ক হয়। পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ৯০,০০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব, যা একজন যুবকের জন্য উল্লেখযোগ্য সহায়তা।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি সাময়িক সহায়তা—স্থায়ী সমাধান নয়। তাই এই সময়টিকে দক্ষতা উন্নয়ন ও চাকরির প্রস্তুতির জন্য কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

বিশেষ সতর্কতা: গুজব নয়, অফিসিয়াল তথ্যেই ভরসা করুন

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন গুজব ছড়াচ্ছে—কোথাও বলা হচ্ছে সহজে টাকা মিলবে, কোথাও আবার ভুয়ো এজেন্ট ঘুরছে। আবেদন করার সময় কোনও মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভর না করে সরাসরি সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।

যুবসাথী প্রকল্প বেকার যুবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা উদ্যোগ। কিন্তু আবেদন করলেই টাকা পাওয়া নিশ্চিত নয়। কর্মসংস্থানের প্রমাণ, অন্য সরকারি ভাতা গ্রহণ বা ভুল তথ্য—এই ধরনের বিষয় ধরা পড়লে আবেদন বাতিল হতে পারে।

তাই সঠিক তথ্য দিয়ে, নিয়ম মেনে এবং সততার সঙ্গে আবেদন করুন। প্রয়োজন হলে সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করে পরিষ্কার ধারণা নিন। সঠিকভাবে আবেদন করলে এই প্রকল্প অনেক যুবকের জীবনে সাময়িক হলেও আর্থিক স্বস্তি এনে দিতে পারে।

Read Also: Jago Scheme 2026: লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পর এবার মহিলাদের জন্য ₹৫,০০০ অনুদান, জানুন সম্পূর্ণ তথ্য